দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর সেই বিশাল ঋণের বোঝা, ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে মাত্রাতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ গ্রুপটিকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে বিদেশে টাকা পাচারের গুঞ্জন ও অ’ভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সিটি গ্রুপের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আর্থিক চাপ সামাল দিতে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে গ্রুপটি। এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাকে ঘিরে বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা। ঋণের ভারে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার থেকে নতুন করে অর্থ তুললে সেই অর্থের দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে—সিটি গ্রুপ, নাকি সাধারণ বিনিয়োগকারী—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি হিসেবে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সঙ্গে চুক্তিও করেছে সিটি গ্রুপ। তবে পুঁজিবাজারে গ্রুপটির কয়টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বিপুল ঋণগ্রস্ত অবস্থায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির পুঁজিবাজারে প্রবেশের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও।
তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাব হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে।
সিটি গ্রুপের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের কর্মকাণ্ড আড়াল করা এবং প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রাখতে গ্রুপের হাতে থাকা গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো থেকে নতুন করে সুবিধা পাওয়ার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে আগের নেওয়া ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়তে থাকায় গ্রুপটি তারল্য সংকটে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মুন্সীগঞ্জে ছয়টি শিল্প প্রকল্পে অপরিকল্পিত বিনিয়োগের কারণে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। বিপরীতে ওই অর্থায়নের খরচ ও সুদ ক্রমাগত জমা হচ্ছে। সিটি গ্রুপ সূত্রের বরাতে আরও জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যখন ব্যাংক খাতকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তখন তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
৪৭ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
প্রধান পাওনাদারদের মধ্যে এইচএসবিসির পাওনা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক পিএলসির ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের কাছেও সিটি গ্রুপের প্রায় ৯৮৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, যথাসময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় গ্রুপটিকে বিশেষ পুনঃগঠন সুবিধার আওতায় খেলাপি হিসেবে গণ্য না করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কিছু সম্পদ বিক্রি করে আংশিক ঋণ সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিটি গ্রুপ জানিয়েছে, লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসকে ইস্যু ম্যানেজার এবং ওয়ান ব্যাংককে ব্যাংকিং পার্টনার হিসেবে রেখে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের চুক্তি করেছে তারা। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর পাশাপাশি প্রাইভেট ইকুইটি, প্রেফারেন্স শেয়ার, করপোরেট বন্ড, সুকুক অথবা অনুমোদিত অন্যান্য খাত থেকেও মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—একটি আর্থিকভাবে চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানের বন্ড বা শেয়ার বিনিয়োগকারীরা কেন কিনবেন? এর আগে ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে একই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিটি গ্রুপের ঋণের প্রকৃত চিত্র ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক সেই উদ্যোগ থেকে সরে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তাবিত তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশা করছে সিটি গ্রুপ। গ্রুপটির বক্তব্য, অর্থায়নের বিকল্পের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে টেকসই একটি উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান এবং লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের এমডি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
তবে সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, সিটি গ্রুপকে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যাংকিংসেবা ও অবকাঠামো সরবরাহে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সঙ্গে ব্যাংকিং পার্টনার ও ব্যাংকার টু দ্য ইস্যু হিসেবে কাজ করবে ওয়ান ব্যাংক পিএলসি। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে সিটি গ্রুপের চুক্তি হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা যায়, সেটি তারাই ঠিক করবে বলে জানান তিনি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় এই ব্যবসায়িক গ্রুপটি বিপুল ব্যাংক ঋণ নিয়ে আর্থিক চাপে পড়েছে—এমন খবর সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তাদের দেওয়া ঋণের কারণে কিছু ব্যাংকের অর্থ আটকে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
গত ১ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপের ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে ২৯টি ব্যাংকে। তিনি জানান, তিনটি লিডিং ব্যাংকের এমডিকে নিয়ে বসে সমস্যার সমাধান বের করার কথা বলা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতা করবে।
এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এখন নতুন করে একই কারণে কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী খেলাপি হলে সেটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা বা ‘এলার্মিং’ বিষয় হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হলে এবং তা আইনের মধ্যে থেকে দেওয়া সম্ভব হলে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
একটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলো কতটা ঋণ আদায় করতে পারবে, সে বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়। চার-পাঁচটি ব্যাংক মিলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধার বা ‘সালভেজ’ করার চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
পুঁজিবাজারে নতুন ঝুঁকির আশঙ্কা
বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভঙ্গুর ঋণ কাঠামোর মধ্যে সিটি গ্রুপের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, সিটি গ্রুপ যদি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থের একটি অংশ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ হারানোর বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, সিটি গ্রুপের মতো বড় কোম্পানির পুঁজিবাজারে আসা উচিত। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে তার মতে, গ্রুপটি বর্তমানে রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগে ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক শেয়ারবাজারে এসেছিল। কিন্তু তাদের শেয়ারগুলো শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। এখন সিটি গ্রুপও যদি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে পরে খারাপ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে তালিকাভুক্ত না করাই ভালো। এতে বাজারের আস্থার জায়গা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারে সিটি গ্রুপের আরও আগেই আসা উচিত ছিল। তবে বিনিয়োগকারী বা বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ছোট সরিষার তেলের মিল থেকে বিশাল শিল্পগোষ্ঠী
১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় একটি ছোট সরিষার তেলের মিল দিয়ে সিটি গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। পরে ভোজ্য তেল, আটা-ময়দা, চিনি, ডাল, চাল, ফিডসহ বিভিন্ন ভোগ্য ও শিল্পপণ্যের ব্যবসায় সম্প্রসারিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমেও বিনিয়োগ রয়েছে গ্রুপটির।
তীর, বেঙ্গল, ন্যাচারাল, জীবন, কুইক বাইট ও জেলফি সিটি গ্রুপের অন্যতম ব্র্যান্ড।
২০২৩ সালে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মারা যান। এরপর তার ছেলে এবং গ্রুপটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।
গ্রুপটির সবচেয়ে বড় ঋণের বোঝা থাকা হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ১০৮ দশমিক ৫৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে। বিপুল অঙ্কের অর্থ সেখানে আটকে যাওয়াও গ্রুপটির বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ছাড়া ২০২২ সালে বিনিময়হারে বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণেও সিটি গ্রুপ লোকসানের মুখে পড়ে বলে জানা গেছে। ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রুপটির মালিকানাধীন ১৮ হাজার ৮৭৫ একর আয়তনের আটটি চা-বাগানের আংশিক বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে।
