‘সকাল ৭টায় শুটিংয়ের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছে, আর ফেরেনি।’ এই গল্পই প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে পুলিশ ও পরিবারকে শুনিয়ে গিয়েছিলেন স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল। কিন্তু পরদিন সকালে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ব্রিজের পাশের একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার হওয়া প্লাস্টিকের বস্তা খুলতেই সামনে আসে ভয়াবহ সত্য। বস্তার ভেতর পাওয়া যায় নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ঢালিউড অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর দুই খণ্ড করা নিথর দে’হ।
রূপালি পর্দার একসময়কার পরিচিত এই অভিনেত্রীর জীবন যে নিজের ঘরের ভেতরেই এমন নির্মম পরিণতির দিকে যাবে, তা হয়তো কেউই ভাবতে পারেননি। ২০২২ সালের আলোচিত এই হ’ত্যাকা’ণ্ড এনডিটিভির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি নিখোঁজ হন অভিনেত্রী শিমু। পরদিন তার বস্তাবন্দি লা’শ উদ্ধারের পর প্রথম দিকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিকে ঘিরে থাকা দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে চিত্রনায়ক জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তবে সেই দিক থেকে তদন্তে কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি।
এরপর তদন্তের দিক ঘুরে যায় শিমু ও তার স্বামী নোবেলের ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে। গাড়িটি তল্লাশি করতে গিয়ে পুলিশ তীব্র ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ পায়। তদন্তকারীদের ধারণা, আলামত ও র’ক্তের দাগ মুছে ফেলতেই ওই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, গাড়ির ভেতর পাওয়া নাইলনের দড়ির সঙ্গে শিমুর লা’শ বাঁধা অবস্থায় থাকা দড়ির হুবহু মিলও খুঁজে পান তদন্তকারীরা। ফলে তদন্তে গাড়িটিই হয়ে ওঠে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পুলিশের কাছে ভেঙে পড়ে স্বীকারোক্তি দেন নোবেল। জানা যায়, ১৬ জানুয়ারি রবিবার সকাল ৭টায় শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তখনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া শুরু হয়েছিল। একপর্যায়ে কথাকাটাকাটি থেকে শিমুকে মারধর এবং শ্বাসরোধ করে হ’ত্যা করেন নোবেল।
হ’ত্যাকা’ণ্ডের পর বন্ধু ফারহাদকে ডেকে আনেন তিনি। প্রমাণ লোপাটের পরিকল্পনায় গৃহকর্মীকে বাইরে নাস্তা কিনতে পাঠিয়ে শিমুর দে’হ কেটে দুই খণ্ড করা হয়। এরপর প্লাস্টিকের বস্তায় সেলাই করে ভরে রাখা হয় দে’হ। দুপুরে লা’শ গুম করার প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলেও রাত ৯টার দিকে কেরানীগঞ্জের নির্জন হযরতপুর ব্রিজের কাছে বস্তাটি ফেলে আসেন তারা।
এরপর ঘটনার মোড় আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। পরদিন সকালে নোবেল নিজেই কলাবাগান থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। অথচ এর আগেই শিমুকে হ’ত্যা করে লা’শ গুমের চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
দাম্পত্যে দীর্ঘদিনের অশান্তি
২০০৪ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন শিমু ও নোবেল। কিন্তু তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না বলে জানা যায়। মানসিক বিষাদ ও চরম সন্দেহের কারণে শিমুর ওপর প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন চালাতেন নোবেল।
করোনা মহামারির সময়ে নোবেলের ব্যবসায় ধস নামার পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন শিমু। এই বিষয়টি নোবেলের পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে আঘাত করেছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি নৃশংস হ’ত্যাকা’ণ্ডের কয়েক মাস আগেও স্বামীর বিরুদ্ধে গৃহনির্যাতনের অভিযোগ থানায় করেছিলেন শিমু।
হ’ত্যাকা’ণ্ডের পর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিজের ছোট মেয়ে ওজিয়া আলিম হৃদকে ফোন করেন নোবেল। সেখানে মাকে হ’ত্যার জন্য মেয়ের কাছেও ক্ষমা চান তিনি।
কাজী হায়াতের ‘বর্তমান’ সিনেমার মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন রাইমা ইসলাম শিমু। প্রায় ২৫টি সিনেমা এবং ৫০টির বেশি নাটকে অভিনয় করা এই সম্ভাবনাময় অভিনেত্রীর জীবন ও ক্যারিয়ারের এমন করুণ সমাপ্তি আজও বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে গভীর বেদনার একটি অধ্যায় হয়ে আছে।


