‘কখনোই, কোনোভাবেই ভুলব না’—৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে আমেরিকার স্মরণ

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে দেশটির বর্তমান ও সাবেক প্রেসিডেন্টরা ভয়াবহ ওই হামলায় নি’\হতদের স্মরণ করেছেন। ২০০১ সালের ওই হামলায় ছিনতাই করা বিমানগুলো নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে আঘাত হানে। দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের ক্ষত, স্মৃতি এবং এর পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীরভাবে উপস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনে আয়োজিত স্মরণসভায় নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জীবিত চার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তাদের স্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন।

হামলার সময়গুলো স্মরণ করতে অনুষ্ঠানে নীরবতা পালন করা হয় এবং হামলায় নি’\হত প্রায় ৩ হাজার মানুষের নাম পাঠ করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘ট্রিবিউট ইন লাইট’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ম্যানহাটনের আকাশে দুটি আলোকরশ্মি জ্বালানো হয়। এ ছাড়া নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন স্থাপনাও নীল আলোয় আলোকিত করা হয়।

৯/১১-এর সময় প্রেসিডেন্ট থাকা জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে শুক্রবার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার প্রাঙ্গণের অনুষ্ঠানে যোগ দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, বারাক ওবামা ও বিল ক্লিনটন।

অন্যদিকে পেন্টাগনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি ৯/১১-এর সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা কনডোলিজা রাইসের সঙ্গে স্মরণসভায় অংশ নেন।

স্মরণসভায় ট্রাম্প বলেন, ‘আজ আমরা সেই পবিত্র অঙ্গীকার আবারও করছি, যা ২৫ বছর আগে তাদের স্মরণে প্রথম করেছিলাম। আমরা কখনোই, কোনোভাবেই ভুলব না। আর এ কারণেই আমরা আজও লড়াই করছি।’

৯/১১-এর পর শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর সঙ্গে বর্তমানে ইরানে চলমান মার্কিন সংঘাতেরও যোগসূত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। ৯/১১ হামলার পর শুরু হওয়া ওই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা বজায় ছিল।

ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান ‘কখনোই, কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না’।

শ্যাঙ্কসভিলেও স্মরণ

পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলেও ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই যাত্রীদের প্রতিরোধের পর ছিনতাই হওয়া ফ্লাইট ৯৩ বিধ্বস্ত হয়েছিল।

জেনিস ব্রুকস ৯/১১ হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। নিজের ভাষায় তিনি এটিকে ‘সবচেয়ে বড় অভিযান’ হিসেবে দেখেছিলেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারের ৮৪তম তলায় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি।

বিবিসিকে ব্রুকস জানান, প্রথম বিমানটি নর্থ টাওয়ারে আঘাত করার সময় তিনি অফিসেই ছিলেন। তিনি ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় দ্বিতীয় বিমানটি ‘ভয়ংকর এক প্রচণ্ড শব্দে’ আঘাত করে।

ব্রুকস বলেন, ধ্বংসস্তূপের আঘাতে এক নারী আহত হওয়ার পর তিনি ‘ভৌতিক সিনেমার মতো একটি চিৎকার’ শুনেছিলেন। এরপর ওপরে তাকিয়ে দেখেন, যেখানে তার অফিস থাকার কথা ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে ‘একটি বিশাল গর্ত’।

প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর হামলার প্রতিটি ঘটনার সঠিক সময় এবং টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার মুহূর্ত স্মরণ করতে ঘণ্টা বাজানো হয়। ছয়টি ঘণ্টার প্রতিটির পর এক মিনিট করে নীরবতা পালন করা হয়।

তবে এবার হামলার পর বিভিন্ন রোগে, যার মধ্যে ক্যানসারও রয়েছে, মৃ’\ত্যুবরণ করা হাজারো মানুষকে স্মরণ করতে সপ্তমবারের মতো ঘণ্টা বাজানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, টুইন টাওয়ার ধসের পর ছড়িয়ে পড়া ধুলা ও ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট অসুস্থতায় পরবর্তীকালে মৃ’\ত্যুবরণ করা মানুষের সংখ্যা হামলায় নি’\হত প্রায় ৩ হাজার মানুষের সংখ্যার তিন গুণেরও বেশি।

সৌদি আরব নিয়ে ক্ষোভ

ম্যানহাটনের স্মরণসভায় প্রায় চার ঘণ্টা ধরে নি’\হতদের নাম পাঠ করা হয়। এ সময় ৯/১১ হামলায় স্বামী হারানো টেরি স্ট্রাডা সৌদি আরবের সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে জবাবদিহির আওতায় আনতে মার্কিন কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার অভিযোগও তোলেন তিনি।

বিশ্বব্যাপী সরাসরি সম্প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে টেরি স্ট্রাডা তার স্বামী টম স্ট্রাডাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘প্রতিটি বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে আরও বেশি করে মনে পড়ে।’

এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কিন্তু ২৫ বছর হয়ে গেল—তবুও কেন তোমার হ’\ত্যায় সৌদি আরবের যে ভূমিকা ছিল, তার জন্য কোনো বিচার পেলাম না?’

টেরি স্ট্রাডা ৯/১১ ফ্যামিলিস ইউনাইটেড সংগঠনের জাতীয় চেয়ারপারসন। তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই করতালি দেন।

৯/১১ হামলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি ছিলেন সৌদি আরবের নাগরিক। হামলার পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন, যিনি সৌদি আরবের একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন।

তবে সৌদি কর্মকর্তারা হামলায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত ৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি সরকার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কিংবা দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও স্মরণ

৯/১১ হামলায় নি’\হতদের সম্মান জানাতে বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

লন্ডনে বাকিংহাম প্যালেসে একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ওয়ারেন স্টিফেনস উপস্থিত ছিলেন।

টরন্টো স্টক এক্সচেঞ্জেও হামলায় নি’\হত সহকর্মীদের স্মরণে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্যান্ডার শহরেও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় ৯/১১-এর দিনটির কথা। সেখানে গিয়েছিলেন কানাডায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। তিনি সেই ছোট শহরটির প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরপরই গ্যান্ডারে ৩৮টি বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার যাত্রীকে সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রা বলেন, ‘আমেরিকার মানুষ যখন গ্যান্ডার শব্দটি শোনে, তখন আমাদের হৃদয় নরম হয়ে আসে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ… কানাডার জনগণকে ধন্যবাদ, আমাদের সঙ্গে অংশীদার থাকার জন্য এবং আমাদের সঙ্গে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার জন্য।’

হোকস্ট্রার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ এবং দুই দেশ একটি বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। ৯/১১-এর স্মরণসভাকে সামনে রেখে গ্যান্ডারের কিছু বাসিন্দা হোকস্ট্রাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানোর আহ্বানও জানিয়েছিলেন।

তা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানে হোকস্ট্রার বক্তব্য করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। পরে আলাদা এক বক্তব্যে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জ্যাঁ ক্রেতিয়েন বলেন, ‘আমার আমেরিকান বন্ধুদের জন্য একটি বার্তা আছে… আমাদের উদারতাকে কখনোই দুর্বলতা বলে ভুল করবেন না।’

৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তির এই স্মরণ আয়োজন তাই শুধু প্রায় ৩ হাজার নি’\হত মানুষের স্মৃতিকে সামনে আনেনি; একই সঙ্গে হামলার পরবর্তী যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পৃক্ততা, জবাবদিহির দাবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা অধ্যায়ও আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।