১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। পূর্ব পাকিস্তানে এটাই ছিল তার প্রথম ও শেষ সফর। দশ দিনের সফরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। তবে সফরের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন।
জিন্নাহ ঢাকায় আসার আগেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভ, ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি চলছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতেই তার ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ ডায়েরিতে লিখেছিলেন, জিন্নাহ হয়তো রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির দাবিকে গুরুত্ব দেবেন—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা দ্রুত ভেঙে যায়।
ঢাকায় জিন্নাহকে ঘিরে প্রস্তুতি
জিন্নাহর সফর উপলক্ষে মুসলিম লীগ সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। গঠন করা হয় অভ্যর্থনা কমিটি ও অন্তত নয়টি উপ-কমিটি। শহরজুড়ে নির্মাণ করা হয় অর্ধশতাধিক তোরণ, টানানো হয় জিন্নাহর ছবি ও পাকিস্তানের পতাকা। রেসকোর্স ময়দানে জনসভার জন্য তৈরি করা হয় বড় মঞ্চ। রাখা হয় আট শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক, অ্যাম্বুলেন্স ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র।
১৯শে মার্চ সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানে ফাতেমা জিন্নাহকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান জিন্নাহ। তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে তাকে স্বাগত জানান খাজা নাজিমুদ্দিন, স্যার ফ্রেডরিক বোর্ন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ অনেকে। তবে বৃষ্টির মধ্যেও বিমানবন্দরে বিপুল জনসমাগম হলেও সাম্প্রতিক পুলিশি নির্যাতনের কারণে ছাত্রদের মধ্যে প্রত্যাশিত উচ্ছ্বাস ছিল না বলে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন।
শুরুতেই ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক
২০শে মার্চ কুর্মিটোলা প্যারেড গ্রাউন্ডে সেনাদের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন জিন্নাহ। এরপর সন্ধ্যায় ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে মহম্মদ তোয়াহা তাকে ভাষা সমস্যার একটি স্মারকলিপি দেন। জিন্নাহ সেটি হাতে নিয়ে পাশে রেখে দেন বলে বদরুদ্দীন উমরের বইতে উল্লেখ আছে।
পরে মুসলিম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
‘রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’
২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। বাংলা ব্যবহারে প্রাদেশিক পর্যায়ে বাধা থাকবে না বললেও রাষ্ট্রের জন্য উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার বক্তব্যে দর্শকদের একাংশ “না, না” বলে প্রতিবাদ করলে জনসভায় হট্টগোল শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বাঙালিদের হতাশা আর গোপন থাকেনি।
তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “কায়েদে আজমের ভাষণ এ প্রদেশের সবাইকে আহত করেছে।”
২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন জিন্নাহ। তিনি বলেন, পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগের ভাষা হবে উর্দু। ভাষা আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেও তুলে ধরেন তিনি।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা তার সামনে “না, না” বলে প্রতিবাদ করতে থাকেন। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন ও একেএম আহসানও ওই প্রতিবাদে ছিলেন বলে বদরুদ্দীন উমরের গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
তর্ক থেকে উত্তেজনা
সেদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন জিন্নাহ। তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাসেম, লিলি খাঁ, মহম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদসহ নেতারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।
আলোচনা একপর্যায়ে তর্কাতর্কিতে গড়ায়। তোয়াহা একাধিক রাষ্ট্রভাষার উদাহরণ হিসেবে কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের কথা তুললে জিন্নাহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। অলি আহাদ তাকে অপসারণের জন্য ইংল্যান্ডের রানীর কাছে আবেদন করার কথা বললে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে উমরের বর্ণনায় উঠে এসেছে।
ফাতেমা জিন্নাহর বেতার ভাষণ
২৪শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের উদ্দেশে ঢাকা বেতারে ভাষণ দেন ফাতেমা জিন্নাহ। পাকিস্তানের অগ্রগতিতে নারীদের ভূমিকা রাখার আহ্বানের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। রাষ্ট্রের ঐক্য সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেন ফাতেমা জিন্নাহ।
চট্টগ্রাম সফর ও বিদায়
২৫শে মার্চ জিন্নাহ চট্টগ্রামে যান। পতেঙ্গা থেকে গভর্নমেন্ট হাউজ পর্যন্ত প্রায় দশ মাইল পথে নির্মাণ করা হয় অন্তত দুইশ তোরণ। হাজারো মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। চট্টগ্রাম বন্দরকে কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্দরে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কর্ণফুলীর স্রোত নিয়ন্ত্রণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য জলবিদ্যুৎ নিয়েও কথা বলেন।
সফর শেষে ২৮শে মার্চ রেডিও পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন জিন্নাহ। ভাষা আন্দোলনকে তিনি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরেন এবং প্রাদেশিকতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। আন্দোলনের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে তার বক্তব্যে আন্দোলন থামেনি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যান।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হলে ঢাকায় পুলিশের গু’\লি বর্ষণে সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরও বেশ কয়েকজন নি’\হত হন।
