জাতীয় সংসদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রতিনিয়ত দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে বক্তব্য শোনা যায়, সেখানেই এবার উঠেছে চাঞ্চল্যকর কেনাকাটার অভিযোগ। সংসদ সচিবালয়ের সাম্প্রতিক ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের ঘটনায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
জানা গেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এটিই ছিল সংসদ সচিবালয়ের প্রথম বড় কেনাকাটা। ১২ মার্চ সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ার পর ২৫ মার্চ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়াদেশ দেওয়া হয় এবং নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ১৫ এপ্রিলেই সরবরাহ সম্পন্ন করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেছেন সদ্য বিদায়ী সচিব কানিজ মাওলা (Kaniz Maola) বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এই ক্রয়ে মোট ১২টি ক্যামেরাসংশ্লিষ্ট আইটেম কেনা হয়েছে। চারটি ক্যামেরা বডির পাশাপাশি চার ধরনের লেন্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ২৪-৭০ এমএম ফোকাল লেন্থের তিনটি লেন্স কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায়, যেখানে প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা। অথচ সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা।
একইভাবে ২৪-১২০ এমএম লেন্স কেনা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকায়, যার বাজারমূল্য ১ লাখ ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। ১৪-২৪ ফোকাল লেন্সের জন্য ব্যয় করা হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা, যেখানে বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ১০০-৪০০ এমএম লেন্সের ক্ষেত্রে খরচ হয়েছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকা, যা বাজারমূল্যের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
ক্যামেরা সেটের আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ছয়টি স্পিডলাইট বা ফ্ল্যাশ কেনা হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩০০ টাকায়—প্রতিটির দাম প্রায় ১ লাখ ১ হাজার টাকা, যেখানে বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি নয়। এছাড়া মেমোরি কার্ড, কার্ড রিডার ও রিচার্জেবল ব্যাটারিতেও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডারে জাপানি ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে ভিন্ন কোম্পানির পণ্য। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জামে অন্য ব্র্যান্ডের লোগো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু পণ্য রাজধানীর সাধারণ বাজার থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
এই সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার প্রোপ্রাইটর হিসেবে রয়েছেন সঞ্জয় কুমার দাস (Sanjay Kumar Das)। প্রতিষ্ঠানটির কোনো ওয়েবসাইট না থাকলেও একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার পরিচয়দানকারী মিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, ‘দামি ব্র্যান্ডের কারণে মূল্য বেশি হয়েছে, পাশাপাশি ভ্যাট-ট্যাক্সও রয়েছে।’ তবে বাজারমূল্যের সঙ্গে দামের বিশাল পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মহিদুল হক (Md. Mahidul Haque) বলেন, একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি নতুন হওয়ায় শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি আগের সচিব নিজেই তত্ত্বাবধান করেছেন এবং সবকিছু নিয়মের ভেতরে রেখেই দ্রুত সম্পন্ন করেছেন, যাতে পরবর্তীতে দায় এড়ানো যায়।
এদিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এক ফটোগ্রাফার বলেন, সংসদ অধিবেশন কক্ষের ছবি তুলতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার ক্যামেরা সেটই যথেষ্ট। সেখানে প্রায় ৫৮ লাখ টাকার সরঞ্জাম কেনা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এবং তার অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
সংসদের বাইরে কাজ করা ফটোগ্রাফাররাও এই কেনাকাটাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, একটি সীমিত পরিসরের কক্ষে ছবি তোলার জন্য এত উচ্চমূল্যের সরঞ্জামের কোনো প্রয়োজনই নেই।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাবেক সচিব কানিজ মাওলার কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
