ইরান যু’\দ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির পাশাপাশি তার প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় দুর্বলতাগুলোকেও সামনে এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট এম গেটস (Robert M. Gates) অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ও জটিল সমরাস্ত্র তৈরির নীতির সমালোচনা করে আসছিলেন। তার মতে, বহু বছর সময় নিয়ে “৯৯ শতাংশ নিখুঁত” অস্ত্র তৈরির চেয়ে কম খরচে দ্রুত কার্যকর “৭৫ শতাংশ সমাধান” ভিত্তিক অস্ত্রই আধুনিক যু’\দ্ধ বাস্তবতায় বেশি কার্যকর হতে পারে।
দুই দশক পার হলেও মার্কিন সমরাস্ত্র শিল্পে সেই কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই এসেছে। বরং সাম্প্রতিক ইরান যু’\দ্ধ পরিস্থিতি দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও দ্রুত ও সাশ্রয়ী উৎপাদনে এখনো পিছিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবস্থা। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে বহুল ব্যবহৃত এই আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইল তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় ৩৬ মাস এবং প্রতিটির উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ লাখ ডলার। অথচ ইরানের তুলনামূলক কম দামের শাহেদ ড্রোন ঠেকাতে যু’\দ্ধে ১ হা’\জা’\র ২০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বৈপরীত্য হলো, যে শাহেদ ড্রোন প্রতিরোধে এত ব্যয়বহুল মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রতিটির খরচ মাত্র ৩৫ হা’\জা’\র ডলার। শুধু তাই নয়, ইরান প্রতি মাসে অন্তত ২০০টি ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে উচ্চমূল্যের জটিল অস্ত্রনির্ভর কৌশল বর্তমান যু’\দ্ধ বাস্তবতায় বড় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে রবার্ট গেটস প্রশ্ন তুলেছিলেন, “ইউক্রেন যদি এক বছরে ৭০ লাখ ড্রোন তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?”
সমস্যাটি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে পেন্টাগন (Pentagon) ও কংগ্রেস এই দুর্বলতা চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেও বাস্তবিক পরিবর্তন খুব কম এসেছে। বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বলে জানানো হলেও সমালোচকরা বলছেন, শুধুমাত্র বিশাল বাজেট সমস্যার সমাধান নয়।
গেটস যেখানে কম খরচে কার্যকর অস্ত্র তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেখানে হেগসেথ আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক বাজেট—এক লাখ ৫০ হা’\জা’\র কোটি ডলারের দাবি তুলেছেন।
রোনাল্ড রিগান ইনস্টিটিউটের পলিসি ডিরেক্টর র্যাচেল হফের মতে, মূল সমস্যা অর্থের নয়; বরং পেন্টাগনের সংস্কৃতি ও আমলাতান্ত্রিক আচরণে। তিনি বলেন, নতুন দপ্তর খোলা বা নতুন কৌশল ঘোষণার চেয়ে চুক্তি ও অস্ত্র অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাস্তব পরিবর্তন বেশি জরুরি। অন্যথায় সবকিছুই “বাগাড়ম্বর” হয়ে থাকবে।
থিংক ট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সামরিক বিশেষজ্ঞ ম্যাকেনজি ইগলিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, পেন্টাগন এমন এক ক্রেতা, যারা অল্প পরিমাণে ক্রয় করে এবং কখনোই বড় পরিসরে উৎপাদনের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না।
তিনি বলেন, জাহাজ, বিমান ও সমরাস্ত্র উৎপাদনে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। ফলে যু’\দ্ধ শুরু হওয়ার পর রাতারাতি উৎপাদন বাড়ানো বাস্তবে সম্ভব হয় না।
ইগলিনের ভাষায়, “এই কাঠামো এতদিনেও বদলায়নি, কারণ বাস্তব যু’\দ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া এর সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি বোঝা যায় না।”
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। পিট হেগসেথ ইতোমধ্যে “৮৫ শতাংশ সমাধান” ভিত্তিক অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন এবং অতিরিক্ত ব্যয়বহুল সমরাস্ত্র প্রকল্পের সমালোচনাও করেছেন।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে বহুসংখ্যক সরবরাহকারীর কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরবরাহকারীদের ওপরও চাপ বাড়ানো হয়েছে।
পেন্টাগন প্রশাসন ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাত্রার সমরাস্ত্র ক্রয়ের নতুন চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে অস্ত্র উৎপাদন তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সময়মতো দ্রুত, কার্যকর ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের সমরাস্ত্র উৎপাদনের দিকে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে, নাকি ব্যয়বহুল পুরোনো মডেলের ভেতরেই আটকে থাকবে?


