বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রবেশ করলেই স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম (Mir Shahe Alam)-এর দৃশ্যমান উপস্থিতি চোখে পড়ে। রাস্তার মোড়, বাজার, ল্যাম্পপোস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালজুড়ে রয়েছে তার ছবি সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার। একই সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরেও বারবার উঠে এসেছে তার নাম। এমনকি কয়েকটি প্রকল্পের ফলকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে দেখা গেছে তার ছেলের প্রতিষ্ঠানের নামও।
শিবগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড গরীবপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরু একটি রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ বসতবাড়ি। কিছুদূর এগোতেই ধানক্ষেত ও সরু আল। এমন অবস্থায়ও সেখানে নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য একাধিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এলাকায় রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্পের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে সড়ক, সেতু ও পথ নির্মাণ খাতে শিবগঞ্জ উপজেলায় বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প। একই সময়ে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া উপজেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জ পেয়েছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা। অথচ একই খাতে দেশের ৩৭৩টি উপজেলার গড় বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং শতাধিক উপজেলা কোনো প্রকল্পই পায়নি।
এই বরাদ্দের কারণে বগুড়া জেলা সড়ক ও সেতু উন্নয়ন খাতে দেশের সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত জেলায় পরিণত হয়েছে। জেলাটিতে মোট বরাদ্দ হয়েছে ১৩২ কোটি টাকা, যা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জেলার তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি।
অতীতে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)-র শাসনামলে গোপালগঞ্জে উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রীভবন নিয়ে যেমন আলোচনা ছিল, তেমনি বর্তমান সময়ে শিবগঞ্জকে ঘিরেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক ও সেতু প্রকল্পে মাথাপিছু বরাদ্দের হিসাবে বগুড়ার অবস্থান ছিল ৫৯তম। অথচ বর্তমানে সেই জেলার একটি উপজেলাই বরাদ্দের শীর্ষে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের আগে তারেক রহমান (Tarique Rahman) জেলা বা এলাকা-ভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বর্তমান বরাদ্দের চিত্র সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচকরা মনে করছেন। কারণ বগুড়ার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি গেছে শিবগঞ্জ উপজেলায়। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক নিবাস হিসেবে পরিচিত গাবতলী উপজেলা পেয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রকল্প।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, শিবগঞ্জের বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোর বড় অংশ গেছে প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠানের কাছে। সবচেয়ে বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত (Mir Shakrul Alam Simanto)-এর প্রতিষ্ঠান মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প পেয়েছে, যা উপজেলার মোট প্রকল্প মূল্যের প্রায় ১৮ শতাংশ।
সীমান্ত শিবগঞ্জ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নামে পাওয়া একাধিক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছেন প্রতিমন্ত্রী নিজেই। এ বিষয়টি স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নেত্র নিউজের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বগুড়ার উন্নয়ন বঞ্চনা দূর করতে বিভিন্ন দপ্তরে ডিও লেটার দিয়েছেন এবং তার ফলেই জেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এসেছে। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেটির লাইসেন্স অনেক আগেই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনগত মালিকানা হস্তান্তর করা যায় না। এটি কেবল প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান করে। ফলে মালিকানা ও আর্থিক স্বার্থ আগের মালিকের কাছেই থেকে যায়। সংশ্লিষ্ট দলিলেও মালিকানা হস্তান্তরের কোনো উল্লেখ নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আমমোক্তারনামা পাওয়া ব্যক্তি মাহাদী হাসান তমাল স্থানীয় যুবদলের নেতা। একইভাবে বরাদ্দ পাওয়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকও স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।
তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জের মোট সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্পের অর্ধেকেরও বেশি গেছে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ৫২টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ৩০টির সঙ্গে দলীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহৃত দরপত্র পদ্ধতিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে ‘লিমিটেড টেন্ডার মেথড’ (এলটিএম)। এই পদ্ধতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের কাছ থেকে দরপত্র নেওয়া হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh)-এর গবেষণা অনুযায়ী, এলটিএম মূলত বিশেষায়িত সেবা বা পণ্যের জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে সাধারণ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম (Mohammad Touhidul Islam) বলেন, বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এলটিএমের আওতায় এনে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কাজ বণ্টনের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে ‘ইম্পর্ট্যান্ট আরবান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (দ্বিতীয় পর্যায়)’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে ১৬টি ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পেয়েছে মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। বাকি অধিকাংশ প্যাকেজও বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও শিবগঞ্জে উন্নয়ন বরাদ্দ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং প্রকল্প বণ্টন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
