প্রায় ৩০ বছর ধরে স্থবির হয়ে থাকা খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দর (Khan Jahan Ali Airport) নির্মাণ প্রকল্পে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (China National Machinery Import and Export Corporation-CMC)। গত ২৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এরপর ৩০ জুলাই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিমানবন্দর নির্মাণে আগ্রহের কথা জানায় কোম্পানিটি। একই সঙ্গে চারটি ভিন্ন বাস্তবায়ন পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও উন্নয়নকর্মীরা। তাদের মতে, বিমানবন্দরটি চালু হলে মোংলা বন্দর (Mongla Port), সুন্দরবন (Sundarbans), দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৎস্য শিল্প, রপ্তানি বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় প্রায় তিন দশক আগে। খুলনা নগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ফয়লা এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য প্রথমে ৯৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রাথমিকভাবে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হলেও এরপর দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ২০১৫ সালে সরকার নতুন করে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের আগস্টে আরও ৫২৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিতে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের কারণে প্রকল্পটি আবারও স্থগিত হয়ে পড়ে।
এরপর থেকে প্রতিবছরই বিমানবন্দর নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপি এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন ব্যবসায়ী ও উন্নয়নকর্মীরা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রকল্পে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, যশোর বিমানবন্দরের প্রায় ৭০ শতাংশ যাত্রীই খুলনার। যশোর থেকে খুলনায় যাতায়াতে সময় ও ভোগান্তি বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তিনি মনে করেন, মোংলা বন্দর, ইপিজেড, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশে খুলনায় একটি বিমানবন্দর অত্যন্ত জরুরি।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা জানান, গত মাসে চীনা প্রতিষ্ঠানটি বিমানবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করা হয় এবং আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ জুলাই বেবিচকের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে বেবিচক।
চীনা কোম্পানির পাঠানো চিঠিতে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য সরকার টু সরকার (জিটুজি) ভিত্তিক সহজ ঋণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), নির্মাণ-পরিচালনা-হস্তান্তর (বিওটি) এবং নকশা, ক্রয়, নির্মাণ ও অর্থায়ন (ইপিসি+এফ) পদ্ধতিসহ একাধিক বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের সম্মতিতে উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আসাদুর রহমান (Asadur Rahman) বলেন, বিমানবন্দর না থাকায় বিদেশি ক্রেতা ও আমদানিকারকদের অনেকেই খুলনায় আসতে আগ্রহ দেখান না। অথচ খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, মোংলা ইপিজেড, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এসব সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে খুলনার কাছাকাছি একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর সময়ের দাবি।
